
তরুণ বয়সে লিভারের রোগ খুব একটা হয় না—এমন ধারণা এখনও অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী অনেক তরুণ-তরুণীর মধ্যেও নীরবে লিভারের ক্ষতি হচ্ছে, যার অন্যতম কারণ ভাইরাল হেপাটাইটিস বি ও সি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিভার এমন একটি অঙ্গ যা দীর্ঘ সময় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রে তেমন কোনো উপসর্গ প্রকাশ পায় না। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তারা দীর্ঘদিন ধরে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। যখন জন্ডিস, পেট ফুলে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অন্যান্য গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে লিভারের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়ে যায়।
হেপাটাইটিস বি সাধারণত আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে নবজাতকের শরীরে, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, দূষিত সুচ বা সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। অন্যদিকে, হেপাটাইটিস সি প্রধানত সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। অনিরাপদ ইনজেকশন, জীবাণুমুক্ত না করা চিকিৎসা সরঞ্জাম, ট্যাটু বা বডি পিয়ার্সিং এবং অতীতে নেওয়া রক্ত সঞ্চালনও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, হেপাটাইটিসের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় খুবই অস্পষ্ট হয়। সামান্য ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব বা লিভার এনজাইম সামান্য বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণকে অনেকে গুরুত্ব দেন না। তাই যাদের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের হেপাটাইটিস বি ও সি-এর জন্য নির্দিষ্ট পরীক্ষা করানো উচিত।
আশার বিষয় হলো, হেপাটাইটিস বি টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। নবজাতকের পাশাপাশি যেসব প্রাপ্তবয়স্ক আগে টিকা নেননি এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন, তাদেরও টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
হেপাটাইটিস সি-এর কোনো টিকা না থাকলেও বর্তমানে কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব। একইভাবে, ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-এর সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, ভাইরাল হেপাটাইটিসের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের হারও বাড়ছে। স্থূলতা, ডায়াবেটিস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এর প্রধান কারণ। ফ্যাটি লিভার ও হেপাটাইটিস একসঙ্গে থাকলে লিভারের ক্ষতি আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
পরিবারে হেপাটাইটিস বি-এর ইতিহাস থাকলে, অতীতে রক্ত সঞ্চালন হয়ে থাকলে, অনিরাপদ পরিবেশে ট্যাটু বা পিয়ার্সিং করালে বা অন্য কোনো ঝুঁকিতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতের গুরুতর জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
তরুণ বয়স থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, টিকা গ্রহণ, নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থা অনুসরণ এবং সময়মতো পরীক্ষা করানোর মাধ্যমে লিভারের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।